ভূমিকা
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার সময় পরিবারের সদস্যদের সাথে নেওয়া একটি বড় সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে বিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য স্পাউস (স্বামী বা স্ত্রী) কে সহায়তা হিসেবে কাছে রাখা মানসিক ও আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটি দেশের ভিসা নীতি ভিন্ন, এবং কিছু দেশে সম্প্রতি কঠোর নিয়ম চালু হয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী স্পাউসসহ পড়তে যাওয়ার উপযোগী ৯টি দেশের বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. ফিনল্যান্ড (Finland)
ফিনল্যান্ড বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সহজ মাধ্যম। ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স উভয় লেভেলেই স্পাউস নেওয়ার সুযোগ আছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—স্পাউস সেখানে ফুল-টাইম (সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা) কাজ করার অনুমতি পান। আবেদনের সময়: মূল ইনটেক Autumn Intake (আবেদন শুরু হয় আগের বছরের ডিসেম্বর-জানুয়ারি)। কিছু ইউনিভার্সিটিতে January ইনটেকও থাকে, তবে প্রোগ্রাম কম থাকে। ভিসা প্রক্রিয়া: স্টুডেন্ট এবং স্পাউস একসাথে ভিসার আবেদন করতে পারেন এবং একসাথেই ফ্লাই করতে পারেন। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.০-৬.৫ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫-৭.০।
২. ডেনমার্ক (Denmark)
ইউরোপের মধ্যে ডেনমার্ক স্পাউসদের জন্য অনেক উদার। ডেনমার্কেও ফিনল্যান্ডের মতো স্পাউস ফুল-টাইম কাজের অনুমতি পান। এমনকি আপনি যদি ব্যাচেলর করতে যান, তবুও স্পাউস সাথে নিতে পারবেন। ডেনমার্কের জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক নিরাপত্তা অত্যন্ত উন্নত। এখানেও ফ্যামিলি সহ একসাথে ফ্লাই করার সুবিধা রয়েছে। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.৫ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫-৭.০।
৩. যুক্তরাজ্য (United Kingdom)
২০২৪ সালের পর থেকে ইউকে-তে স্পাউস ভিসার নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন সাধারণ মাস্টার্স (Taught Masters) প্রোগ্রামে স্পাউস নেওয়া যায় না। তবে আপনি যদি পিএইচডি (PhD) বা গবেষণামূলক মাস্টার্স (Postgraduate Research) করতে যান, তবেই কেবল স্পাউস নিতে পারবেন। স্পাউস সেখানে ফুল-টাইম কাজ করতে পারেন। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.০ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.০-৬.৫।
৪. কানাডা (Canada)
কানাডা তাদের স্পাউস ওপেন ওয়ার্ক পারমিট (SOWP) এর নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বর্তমানে কেবল মাস্টার্স (কমপক্ষে ১৬ মাস মেয়াদী) এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীরা তাদের স্পাউসকে সাথে নিতে পারেন। সাধারণ ডিপ্লোমা বা ব্যাচেলর কোর্সের জন্য এখন আর স্পাউস ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। স্পাউস 'ওপেন ওয়ার্ক পারমিট' পান, যার মাধ্যমে তিনি যেকোনো কোম্পানিতে কাজ করতে পারেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জোরালো প্রমাণ এবং ব্যাংক ব্যালেন্স প্রয়োজন। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.০-৬.৫ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫-৭.০।
৫. অস্ট্রেলিয়া (Australia)
অস্ট্রেলিয়া স্পাউস বা ডিপেন্ডেন্ট ভিসার জন্য সবসময়ই একটি আকর্ষণীয় দেশ। ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স—উভয় ক্ষেত্রেই স্পাউস নেওয়া যায়। তবে মাস্টার্স বাই রিসার্চ বা পিএইচডি স্টুডেন্টদের স্পাউসরা আনলিমিটেড কাজের সুযোগ পান। ভিসা আবেদনের সময় অবশ্যই স্পাউসের কথা উল্লেখ করতে হবে, নাহলে পরবর্তীতে তাকে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আইইএলটিএস-এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমা (OSHC) এবং পর্যাপ্ত ফান্ড থাকা জরুরি। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.০ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫।
৬. সুইডেন (Sweden)
ইউরোপের মধ্যে সুইডেনকে বলা হয় স্পাউসদের জন্য স্বর্গ। আপনি যদি মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে যান, তবে আপনার স্পাউস সাথে যেতে পারবেন এবং তিনি সেখানে ফুল-টাইম কাজের অনুমতি (Work Permit) পাবেন। সুইডেনে স্পাউস কেবল কাজই নয়, চাইলে সেখানে ফ্রিতে বা স্বল্প খরচে পড়াশোনাও করতে পারেন। এছাড়া সেখানে শিশুদের পড়াশোনা এবং চিকিৎসা সুবিধা অত্যন্ত উন্নত। আবেদনের সময়: সেপ্টেম্বর ইনটেকের জন্য আবেদন চলে ১৬ অক্টোবর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। জানুয়ারি ইনটেকের আবেদন শেষ হয় আগস্টে। শর্ত: আপনার কোর্সের মেয়াদ কমপক্ষে ১ বছর হতে হবে এবং স্পাউসের জন্য অতিরিক্ত ব্যাংক ব্যালেন্স (মাসে প্রায় ৪,৪৪০ সুইডিশ ক্রোনা) দেখাতে হবে। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.৫ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫।
৭. জার্মানি (Germany)
জার্মানি বরাবরই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ কারণ পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোতে টিউশন ফি নেই বললেই চলে। স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যাওয়ার পর বা যাওয়ার সময় আপনি 'ফ্যামিলি রিইউনিয়ন' (Family Reunion) ভিসার মাধ্যমে স্পাউস নিতে পারেন। স্পাউস সেখানে থাকার অনুমতি পাওয়ার পর ফুল-টাইম কাজ করতে পারেন। জার্মানির শক্তিশালী ইকোনমি কাজের প্রচুর সুযোগ তৈরি করে। শর্ত: এক্ষেত্রে স্পাউসকে সাধারণত জার্মান ভাষার প্রাথমিক ধাপ A1 লেভেল সম্পন্ন করতে হয়। এছাড়া দু’জন থাকার মতো পর্যাপ্ত বড় বাসা এবং পর্যাপ্ত মাসিক ইনকাম বা ব্লক অ্যাকাউন্টে টাকা থাকা জরুরি। IELTS: ব্যাচেলর ও মাস্টার্স উভয়ের জন্য ৬.০-৬.৫।
৮. নরওয়ে (Norway)
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর উচ্চমানের জীবনযাত্রার দেশ নরওয়ে। নরওয়েতে স্টুডেন্ট ভিসার সাথে স্পাউস নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে এক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছলতার (Financial Solvency) প্রমাণ খুব কঠোরভাবে দেখা হয়। স্পাউস ফুল-টাইম কাজের অনুমতি পান। নরওয়েজিয়ান শিক্ষা ব্যবস্থা স্পাউস এবং সন্তানদের জন্য বেশ সহায়ক। শর্ত: সাধারণত স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বয়সই অন্তত ২৪ বছর হতে হয় (কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড় আছে) এবং থাকার জায়গার নিশ্চয়তা দিতে হয়। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৬.০ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.৫।
৯. দক্ষিণ কোরিয়া (South Korea)
এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে গবেষণার জন্য দারুণ একটি জায়গা। আপনি যদি মাস্টার্স বা পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হন, তবে F-3 (Dependent Visa) এর মাধ্যমে স্পাউস নিতে পারেন। স্টেম (STEM) ফিল্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে প্রচুর স্কলারশিপ আছে। স্পাউস সাথে থাকলে মানসিকভাবে শান্তিতে থাকা যায়। তবে কোরিয়াতে স্পাউস সরাসরি কাজ করার অনুমতি পান না। কাজ করতে চাইলে আলাদা করে ইমিগ্রেশন অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয় বা পার্ট-টাইম জবের জন্য অ্যাপ্লাই করতে হয়। IELTS: ব্যাচেলরের জন্য ৫.৫-৬.০ এবং মাস্টার্সের জন্য ৬.০ (MOI accepted)।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
স্পাউস নিতে গেলে প্রায় সব দেশেই আপনার ব্যক্তিগত খরচের পাশাপাশি স্পাউসের জন্য অতিরিক্ত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেখাতে হয়। অনেক দেশে (যেমন জার্মানি বা সুইডেন) ভিসা পাওয়ার আগে আপনাকে প্রমাণ করতে হয় যে আপনার কাছে দু’জন থাকার মতো পর্যাপ্ত বড় বাসা রয়েছে। কিছু দেশে স্টুডেন্ট এবং স্পাউস এক সাথে আবেদন করতে পারেন (যেমন- ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন), আবার কিছু দেশে স্টুডেন্ট আগে গিয়ে বাসা ও জবের ব্যবস্থা করার পর স্পাউসকে নিতে পারেন (যেমন- জার্মানি)। তাই প্রয়োজনীয় সব তথ্য জেনে এবং পরিকল্পনা করে আবেদন করা জরুরি।
উপসংহার
উপরের দেশগুলোর প্রতিটিরই নিজস্ব সুবিধা ও শর্ত রয়েছে। আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষার দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য এবং ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সঠিক দেশ বেছে নিন। ২০২৬ সালে স্পাউসসহ বিদেশে উচ্চশিক্ষা এখনও সম্ভব, তবে আগের চেয়ে আরও বেশি প্রস্তুতি ও সচেতনতা দরকার।
